ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

শীর্ষ ২০ খেলাপির জন্য আলাদা কৌশল, ১৮ মাসের রোডম্যাপ

২০২৬ অক্টোবর ০৬ ০৮:৩৩:২৯
শীর্ষ ২০ খেলাপির জন্য আলাদা কৌশল, ১৮ মাসের রোডম্যাপ

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে লক্ষ্য করে পৃথক ঋণ আদায় কৌশল তৈরির নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ উদ্ধারে প্রতিটি ব্যাংকে বিশেষ আদায় দল গঠন এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ভঙ্গুর ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য ১৪ থেকে ১৮ মাসের একটি রোডম্যাপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি)। বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এফআইডির সচিব নাজমা মোবারেক। তিনি বলেন, ব্যাংক খাত শক্তিশালী করতে হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে হবে। সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় ও কমিয়ে আনা সম্ভব।

শীর্ষ ২০ খেলাপির জন্য আলাদা পরিকল্পনা

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। এ পরিস্থিতি বদলাতে প্রতিটি বড় ঋণগ্রহীতার জন্য আলাদা ‘ব্যাংক হিসাবভিত্তিক ঋণ উদ্ধার কৌশল’ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই পরিকল্পনায় কার কাছে কত টাকা পাওনা, কী পরিমাণ জামানত রয়েছে, আইনি অবস্থান কী এবং টাকা আদায়ের সম্ভাবনা কতটুকু—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা হবে। এরপর প্রত্যেক ঋণগ্রহীতার জন্য নির্দিষ্ট কৌশল অনুযায়ী আদায় কার্যক্রম চালানো হবে।

এ জন্য নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং তাঁদের কাজের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ দল

প্রতিটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য বিশেষ দল গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব দলের জন্য মাসিক নগদ আদায়ের নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকবে। শাখাভিত্তিক আদায় কার্যক্রমও নিয়মিত মূল্যায়ন করা হবে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক কর্মমূল্যায়নে খেলাপি ঋণ থেকে নগদ আদায় এবং নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরি ঠেকানোর বিষয় যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ নিয়মিত আদায় দলের কাজের অগ্রগতি তদারকি করবে।

খাতায় নয়, নগদ আদায়ে জোর

খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে শুধু হিসাবের খাতায় ঋণ নিয়মিত দেখানো নয়, প্রকৃত নগদ আদায়ের ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন বা হিসাব সমন্বয়কে ঋণ আদায় হিসেবে দেখানো যাবে না। এসব ব্যবস্থার নিজস্ব প্রয়োজন থাকলেও ব্যাংকের তারল্য, আয় ও মূলধন শক্তিশালী করতে প্রকৃত নগদ আদায়ের বিকল্প নেই।

ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ছাড় নয়

বৈঠকে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও এককালীন নিষ্পত্তির সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ব্যবসা করার সক্ষমতা আছে, কিন্তু সাময়িক সংকটে পড়েছেন—এমন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এসব সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে অতীতে এসব সুবিধার অপব্যবহার করে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখা বা বারবার সময় বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা, অর্থ পাচার করা বা আদায় কার্যক্রমে সহযোগিতা না করা গ্রাহকদের কোনো ছাড় না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ধরনের গ্রাহকদের বিরুদ্ধে সরাসরি কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি কোনো ঋণ এককালীন নিষ্পত্তির আগে মামলা চালিয়ে বা জামানত বিক্রি করে কত টাকা উদ্ধার করা সম্ভব, সেটিও যাচাই করতে হবে।

পর্ষদের ভূমিকা বদল

রোডম্যাপে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকারও পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে। দৈনন্দিন ব্যাংক পরিচালনায় হস্তক্ষেপ না করে পর্ষদকে কৌশলগত নীতি নির্ধারণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।

সরকারি সহায়তার বদলে নিজস্ব আয়

খেলাপি ঋণ ও প্রয়োজনীয় সংস্থান ঘাটতির কারণে কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক মূলধন সংকটে রয়েছে। এ অবস্থায় শুধু সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব আয় বাড়িয়ে মূলধন শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

গ্রাহকসেবা উন্নয়ন, প্রবাসী আয় সংগ্রহ এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফি-ভিত্তিক আয় বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বেশি সুদের আমানতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তুলনামূলক কম খরচের স্থিতিশীল আমানত বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ঋণের পরিমাণ নয়, মানে গুরুত্ব

রোডম্যাপে শুধু ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ানোর বদলে ঋণের মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি, নারী উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল খাতে মানসম্পন্ন ঋণ বাড়াতে বলা হয়েছে।

প্রতিটি শাখাকে প্রতি মাসে অন্তত দুটি যোগ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ঋণ বিতরণের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। তবে ঋণটি নির্ধারিত খাতে ব্যবহার হচ্ছে কি না এবং গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করেই ঋণ দিতে হবে।

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে

দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণও ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

এ অবস্থায় শীর্ষ খেলাপিদের জন্য পৃথক পরিকল্পনা, নগদ আদায়ের লক্ষ্য এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় ও আর্থিক সক্ষমতায় কতটা পরিবর্তন আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন