ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩

লভ্যাংশে পনেরো শতাংশ কর—শঙ্কা ও আশঙ্কার শেয়ারবাজার

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১০ ০৯:৪১:১৬
লভ্যাংশে পনেরো শতাংশ কর—শঙ্কা ও আশঙ্কার শেয়ারবাজার

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তর করা এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়ানো—লক্ষ্যই যদি আমাদের অর্থনীতির নীতির অংশ হয়, তাহলে লভ্যাংশের ওপর করনীতি সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কিন্তু নগদ লভ্যাংশের ওপর ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীর জন্য ১৫ শতাংশ উৎসে কর আরোপের বর্তমান ব্যবস্থা কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী ব্যক্তির লভ্যাংশে ১০ শতাংশ এবং কর শনাক্তকরণ নম্বর না থাকা ব্যক্তির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ উৎসে কর কাটা হতো। এর মধ্যে একটি নীতিগত যুক্তি ছিল—যারা কর ব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন, কর শনাক্তকরণ নম্বর নিয়েছেন এবং নিয়মিত আয়কর বিবরণী দাখিল করছেন, তাঁদের কিছুটা কর-সুবিধা দেওয়া। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কর শনাক্তকরণ নম্বর থাকুক বা না থাকুক, উভয়ের জন্য একই ১৫ শতাংশ করহার নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে একজন নিয়মিত করদাতা এবং একজন কর শনাক্তকরণ নম্বরবিহীন বিনিয়োগকারীর মধ্যে লভ্যাংশ করের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য থাকছে না।

এখানেই ন্যায্যতার প্রশ্নটি সামনে আসে। একজন নাগরিককে কর ব্যবস্থায় আনতে সরকার যখন কর শনাক্তকরণ নম্বর গ্রহণ ও আয়কর বিবরণী দাখিলকে উৎসাহিত করে, তখন সেই কর-অনুগত্যের কোনো বাস্তব আর্থিক সুবিধা না থাকলে ভবিষ্যতে এর প্রণোদনা কতটা কার্যকর থাকবে? আরও বড় প্রশ্ন হলো লভ্যাংশের ওপর করের সামগ্রিক বোঝা।

ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ার কিনলেন। তিনি শুধু একটি শেয়ার কিনছেন না; তিনি ওই কোম্পানির ব্যবসার একজন অংশীদার বা মালিকানার অংশীদার হচ্ছেন। কোম্পানি ব্যবসা শেষে মুনাফা অর্জন করে এবং সেই মুনাফার ওপর কোম্পানি পর্যায়ে আয়কর প্রদান করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রযোজ্য আইনগত করহার ৪৫ শতাংশ হলেও অন্যান্য কর ও কর-সংক্রান্ত দায় বিবেচনায় কোম্পানির কার্যকর করের বোঝা ৫৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এরপর কোম্পানি কর-পরবর্তী মুনাফা থেকে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রদান করে। কিন্তু সেই লভ্যাংশ বিনিয়োগকারীর হাতে পৌঁছানোর আগে আবার ১৫ শতাংশ উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়।

একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক। ধরা যাক, কোম্পানিটি ১০০ টাকা মুনাফা অর্জন করল এবং সব ধরনের কর বিবেচনায় কোম্পানি পর্যায়ে কার্যকর করের পরিমাণ ৫৫ টাকা। তাহলে অবশিষ্ট থাকে ৪৫ টাকা। এই ৪৫ টাকা যদি লভ্যাংশ হিসেবে শেয়ারহোল্ডারকে দেওয়া হয়, তাহলে তার ওপর ১৫ শতাংশ অর্থাৎ ৬ টাকা ৭৫ পয়সা উৎসে কর কাটা হবে। ফলে বিনিয়োগকারীর হাতে থাকবে মাত্র ৩৮ টাকা ২৫ পয়সা।

অর্থাৎ ১০০ টাকা কর-পূর্ব কোম্পানি মুনাফার বিপরীতে কোম্পানি ও শেয়ারহোল্ডার পর্যায়ে মোট করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬১ টাকা ৭৫ পয়সা।

অবশ্যই আইনগতভাবে কোম্পানি এবং শেয়ারহোল্ডার দুটি পৃথক করদাতা। তাই একে সরাসরি একই ব্যক্তির ওপর দ্বৈত কর বলা ঠিক হবে না। কিন্তু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একই কোম্পানির মুনাফা প্রথমে কোম্পানি পর্যায়ে এবং পরে লভ্যাংশ বিতরণের সময় আবার করের আওতায় আসছে। ফলে অর্থনৈতিক দ্বৈত করের প্রশ্নটি ওঠা স্বাভাবিক।

এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদানকারী ভালো কোম্পানির শেয়ারে। একজন বিনিয়োগকারী যখন কোনো শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেন, তখন শুধু শেয়ারপ্রতি আয় বা নিট সম্পদমূল্য দেখেন না; তিনি দেখেন কর-পরবর্তী হাতে পাওয়া প্রকৃত আয়। লভ্যাংশের ওপর কর বাড়লে প্রকৃত লভ্যাংশ-আয় কমে যায়। তখন বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারের বিকল্প হিসেবে ব্যাংক আমানত, সরকারি সিকিউরিটিজ কিংবা অন্যান্য স্থির আয়ের বিনিয়োগের সঙ্গে প্রকৃত রিটার্ন তুলনা করবেন।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার যখন দীর্ঘদিন ধরে তারল্য সংকট, বিনিয়োগকারীর আস্থার ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের স্বল্পতার সঙ্গে লড়ছে, তখন লভ্যাংশভিত্তিক বিনিয়োগের আকর্ষণ আরও কমিয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত—সেটি নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সমাধান অবশ্যই কর কমানোই একমাত্র পথ নয়। বরং করনীতিতে কর-অনুগত্যের জন্য কার্যকর প্রণোদনা তৈরি করা যেতে পারে। যেমন—কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী এবং নিয়মিত আয়কর বিবরণী দাখিলকারী বিনিয়োগকারীর লভ্যাংশের ওপর ৫ শতাংশ এবং কর শনাক্তকরণ নম্বর না থাকা বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ উৎসে কর আরোপের ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে একদিকে নিয়মিত করদাতারা উৎসাহিত হবেন, অন্যদিকে কর শনাক্তকরণ নম্বর গ্রহণ ও কর-অনুগত্যের প্রবণতা বাড়তে পারে।

সরকারের রাজস্ব প্রয়োজন—এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু একটি ভালো করনীতি শুধু কত টাকা কর আদায় হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে, সেই করনীতি বিনিয়োগ, সঞ্চয়, শেয়ারবাজার এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর কী প্রভাব ফেলছে।

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণ বা নীতিগত সংস্কার যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগের কর-পরবর্তী আয়কেও আকর্ষণীয় রাখতে হবে।

রাজস্ব সংগ্রহ জরুরি। কিন্তু রাজস্ব আহরণের এমন পদ্ধতি আরও জরুরি, যা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত না করে বরং বিনিয়োগ বাড়ায়। শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করার পথে করনীতি যেন বাধা নয়, বরং সহায়ক শক্তি হয়—এটাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের মূল বিবেচনা।

লেখক পরিচিতি: মো. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, ফেলো মেম্বার অব আইসিএমএবি

ইমেইল: sajjad.hossain@squaregroup.com

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন