ঢাকা, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩

বিএসইসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে রাইট নেওয়ার পাঁয়তারা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৩ ১০:০৮:২২
বিএসইসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে রাইট নেওয়ার পাঁয়তারা

মাত্র ৭ পয়সা ইপিএস নিয়ে প্রায় ৯৬৮ কোটি টাকার রাইট শেয়ার ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত জিপিএইচ ইস্পাত পিএলসি। কোম্পানিটির এই উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সঙ্গে মালিকপক্ষের পুরোনো সম্পর্ককে কি রাইট শেয়ার অনুমোদনের ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে?

জিপিএইচ ইস্পাতের পরিচালনা পর্ষদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মাত্র ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস হয়েছে মাত্র ৭ পয়সা। অথচ এই দুর্বল আয় ও সামান্য লভ্যাংশের মধ্যেই বিদ্যমান একটি সাধারণ শেয়ারের বিপরীতে দুটি রাইট শেয়ার ছাড়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি রাইট শেয়ারের মূল্য ধরা হয়েছে ১০ টাকা। এতে কোম্পানিটি তুলতে চায় প্রায় ৯৬৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই একই কোম্পানির বড় অঙ্কের মূলধন সংগ্রহের প্রস্তাব আগেও বিএসইসির অনুমোদন পায়নি। ২০২৫ সালের ২৭ মে কমিশন জিপিএইচ ইস্পাতের ১:৩ অনুপাতে রাইট শেয়ার ছাড়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ওই প্রস্তাবে প্রতিটি রাইট শেয়ারের মূল্য ছিল ১৫ টাকা এবং এর মাধ্যমে প্রায় ২৪২ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল।

এরপর একই বছরের ২২ জুন কোম্পানিটির ৫০০ কোটি টাকার অগ্রাধিকার শেয়ার ছাড়ার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করে বিএসইসি। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে কোম্পানিটির বড় অঙ্কের মূলধন সংগ্রহের দুটি উদ্যোগই নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পায়নি।

এবার সেই জিপিএইচ ইস্পাতই আরও বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। আগের প্রস্তাবের তুলনায় এবারের রাইট ইস্যুর আকার কয়েক গুণ বেশি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতা, রাইট শেয়ারের প্রয়োজনীয়তা এবং অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনায় এমন কী পরিবর্তন এসেছে যে এবার প্রায় ৯৬৮ কোটি টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খানের পুরোনো পেশাগত সম্পর্কের বিষয়টি। বিএসইসির চেয়ারম্যান হওয়ার আগে তিনি ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জিপিএইচ ইস্পাতও একই মালিকানাধীন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। ফলে একই মালিকগোষ্ঠীর একটি কোম্পানির বড় অঙ্কের রাইট শেয়ার প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই স্বার্থের সংঘাত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান ব্যক্তিগতভাবে জিপিএইচ ইস্পাতের রাইট শেয়ার অনুমোদনে প্রভাব খাটিয়েছেন। তাই মূল প্রশ্নটি হলো—মালিকগোষ্ঠীর সঙ্গে তার আগের সম্পর্কের কারণে জিপিএইচ ইস্পাত কি বাড়তি সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করছে কি না এবং এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ থাকবে।

বিশেষ করে যেখানে কোম্পানিটির ইপিএস মাত্র ৭ পয়সা, নগদ লভ্যাংশ মাত্র ২ শতাংশ এবং এর আগের রাইট ও অগ্রাধিকার শেয়ার প্রস্তাব কমিশন প্রত্যাখ্যান করেছিল, সেখানে এবার প্রায় ৯৬৮ কোটি টাকা তোলার উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।

রাইট শেয়ারের অর্থ কোথায় ব্যবহার হবে, এর মাধ্যমে কোম্পানির আয় কতটা বাড়বে, বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা কীভাবে উপকৃত হবেন এবং এত বড় মূলধন সংগ্রহের যৌক্তিকতা কী—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা না থাকলে এই উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

কারণ শেয়ারবাজারে দুর্বল আর্থিক ফলাফলের একটি কোম্পানি যখন হঠাৎ করে বিপুল অঙ্কের মূলধন সংগ্রহ করতে চায়, তখন শুধু কোম্পানির প্রয়োজন নয়, প্রস্তাবটি কার স্বার্থে এবং কী প্রক্রিয়ায় অনুমোদন পাচ্ছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন